টিটেনাস বা ধনুস্টংকার কি, কেন হয়, লক্ষণ কি এবং তার চিকিৎসা – NariBangla

টিটেনাস বা ধনুস্টংকার কি, কেন হয়, লক্ষণ কি এবং তার চিকিৎসা

2 Replies

Health

টিটেনাস বা ধনুস্টংকার রোগ নিঃসন্দেহে একটি ঘাতক ব্যাধি যাতে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আমাদের দেশে প্রতি বছর গড়ে বিশ থেকে পঁচিশ হাজার লোক শুধু এ-রোগে আক্রান্ত হয়েই মারা যায়। তাই জানা দরকার টিটেনাস বা ধনুস্টংকার কি, কেন হয়, লক্ষণ কি এবং তার চিকিৎসা।

টিটি টিকা কি কেন এবং কখন নিতে হয়

টিটেনাস বা ধনুষ্টংকার কি?

টিটেনাস বা ধনুষ্টংকার একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ যা প্রধানত মাংসপেশী ও স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। প্রাণঘাতী এই সংক্রমণের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াটির নাম ক্লসট্রিডিয়াম টিটানি। এর বাসস্থান হল মাটি ও ময়লা আবর্জনা। যে কোন ছোটখাটো কাটাছেঁড়ার মধ্য দিয়ে এটি মানুষের শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। মানবদেহে এসে এটি এমন একটি টক্সিন তৈরী করে যার প্রভাবে স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয় এবং চোয়াল ও কিছু নির্দিষ্ট স্থানে মাংসপেশীর সংকোচন ঘটে।

ধনস্টংকার হয় ক্লসট্রিডিয়াম টিটানি নামক ব্যাকটেরিয়া দিয়ে। এই ব্যাকটেরিয়াটি এক ধরনের স্পোর তৈরিকারী এনেরবিক ব্যাকটেরিয়া। অর্থাৎ এটি বংশবৃদ্ধি করে অক্সিজেন শূন্য মাধ্যমে (এনেরবিক) এবং এটি স্পোর তৈরি করতে পারে। এ কারণে এটি আমাদের শরীরের আঘাতপ্রাপ্ত জায়গায়, যেখানে কলা (টিস্যু) ধ্বংস হচ্ছে, সেখানে বংশবৃদ্ধি করে। আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে কোষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় অথবা অন্যান্য এরবিক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কারণে অক্সিজেন শূন্য পরিবেশ তৈরি হয়। ক্লসট্রিডিয়াম টিটানি যখন আমাদের শরীরে আক্রমণ করে তখন এক বিশেষ ধরনের টক্সিন (বিষ জাতীয় পদার্থ) তৈরি করে। উক্ত টক্সিন আমাদের শরীরের রক্তের মধ্য দিয়ে ঢুকে স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। আর যেহেতু আমাদের শরীরের মাংসপেশি স্নায়ুতন্ত্রের সাথে সংযুক্ত, মাংশপেশি শক্ত হয়ে যায়। এ রোগে রোগীর মুখম-ল, ঘাড় ও পিঠের মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায়। ফলে রোগী মুখ খুলতে পারে না এবং ঘাড় নাড়াতে পারে না। পিঠ বাঁকা হয়ে ধনুকের মতো হয়ে যায়। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত রোগীদের খিঁচুনিও হতে পারে।

নারীর জন্য টিটি টিকা কেন জরুরী

টিটেনাস বা ধনুষ্টংকার এর লক্ষণ

এ রোগের জীবাণু এক থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।

  • প্রথম দিকে ঘাড়, শরীরের পেছন দিক এবং পেটে ব্যথা হতে পারে।
  • জ্বর থাকতে পারে।
  • মাংসপেশিগুলো সংকুচিত হতে থাকে এবং প্রচ- খিঁচুনি হতে পারে। মুখের মাংসপেশিগুলো শক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে হাঁ করতে অসুবিধা হয়।
  • শরীরের পেছনের মাংসপেশিগুলো সংকুচিত হয় বলে পুরো শরীর ধনুকের মতো বেঁকে যায়।
  • যে কোনো ব্যথা, শব্দ, আলো ইত্যাদির কারণে খিঁচুনি আরম্ভ হয় এবং ৩-৪ মিনিট স্থায়ী হয়।
  • শ্বাসকষ্ট হয় এবং রোগী ঢোক গিলতেও পারে না।
  • শরীরের কাটা জায়গা, যার মাধ্যমে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে, সেখানে ইনফেকশন হতে পারে।

ধনুষ্টংকারের জীবাণু শরীরে প্রবেশের পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে এমনকি মাসখানেকও লেগে যেতে পারে। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ছোট একটি ক্ষত বা কাঁটার খোঁচার কথা ভুলে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। আর এ কারণেই টিটেনাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরী, যাতে আঘাত সামান্য হলেও আমরা এই অতি গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাক্সিনটিকে উপেক্ষা না করি। এটি টিটেনাস সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার টক্সিনের বিরুদ্ধে আমাদের দেহকে সুরক্ষিত করে এবং সম্ভাব্য সংক্রমণ থেকে বাঁচায়।

নারীর জন্য টিটি টিকা

আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা

  • আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে এমন স্থানে রাখতে হবে, যেখানে আলো ও শব্দ কম থাকে।
  • টিআইজি বা টিটেনাস ইমিউনোগ্লোবিউলিন ইনজেকশন দিয়ে টক্সিনকে নিষ্ক্রিয় করতে হবে।
  • আগে যদি টিটেনাসের কোনো টিকা দেওয়া না থাকে, তবে তিনটি টিআইজি দিতে হবে।
  • বেনজাইল পেনিসিলিন ইনজেকশন ৬০০ মিগ্রা করে ৬ ঘণ্টা পর পর (যদি এই ওষুধে অ্যালার্জি থাকে, তবে বিকল্প হিসেবে মেট্রোনিডাজল ইনজেকশন দেওয়া যেতে পারে) দিতে হবে।
  • ডায়াজিপাম, লোরাজিপাম অথবা ক্লোরপ্রোমাজিন জাতীয় ইনজেশন শিরায় দিতে হবে। এতে খিঁচুনি ও মাংসপেশি শক্তভাব হবে। প্রতিরোধ
  • আক্রান্ত ক্ষতস্থান হাইড্রোজেন-পারঅক্সাইড দিয়ে পরিষ্কার করতে
  • শিশুর জন্মের পর পরই সব টিকা নেয়া।
  • মা গর্ভবতী হলে পর্যায়ক্রমে ৩টি টিটি ইনজেকশন নেয়া।
  • ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ৫টি টিটি ইনজেকশন পর্যায়ক্রমে নেয়া।
  • মহিলার প্রসবের পর ১টি টিটি ইনজেকশন নেয়া। শিশুর জন্মের পর টিটি টিকা দেয়ার সময়গুলো হলো, প্রথম ডোজ জন্মের প্রথম দিন, দ্বিতীয় প্রথম ডোজের ৪ সপ্তাহ পর, এর সময়কাল ৩ বছর পর্যন্ত তৃতীয় দ্বিতীয় ডোজের ৬ মাস পর, এর সময়কাল ৫ বছর পর্যন্ত চতুর্থ তৃতীয় ডোজের ১ বছর পর, এর সময়কাল ১০ বছর পর্যন্ত পঞ্চম চতুর্থ ডোজের ১ বছর পর, এর সময়কাল আজীবন।

টিকা দেয়ার পর সেই স্থানে ব্যথা, লাল হওয়া, ফুলে যাওয়া, জ্বর, গা ব্যথা ইত্যাদি হতে পারে। এগুলো সাধারণত আপনাতেই সেরে যায়। তবে কখনো গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও দেখা যেতে পারে্‌, যেমন শ্বাসকষ্ট, বমি, রক্তচাপ খুব কমে যাওয়া, পুরো শরীর লাল হয়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের শরনাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

টিটি টিকা কি কেন এবং কখন নিতে হয়

(টিটেনাসের লক্ষণ দেখা দিলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হউন এবং ডাক্তারের পরামর্শ আনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করুন। এই পেজে দেয়া তথ্যগুলো শুধুই আপনার অবগতির জন্য, কখনোই নিজে নিজে চিকিৎসা নেয়ার জন্য নয়।)

2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

//GA Code Start //GA code end